জুলাই’২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনারসৃষ্টি হয়েছে। এই নতুন অধ্যায় যারা রচনা করেছেন তারাই বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি,যা দেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ।এই এক তৃতীয়াংশ যুব সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলা,তারুণ্যের শক্তিকে কাজে না লাগানো, দেশের আর্থ-সামাজিক ও নীতি নির্ধারণে তাদের আকাঙ্খাকে পাত্তা না দেওয়াসহ নানা বৈষম্য ও কর্তৃত্বপরায়ণতার বিরুদ্ধে তাই তারুণ্যের অবশ্যম্ভাবী জয় হয়েছে। বৈষম্যমূলক কর্মসংস্থানের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট আন্দোলন বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুব সমাজের কর্মহীনতার প্রত্যাশাকে আরও স্পষ্ট করেছে। গঠিত হয়েছে নতুন অন্তবর্তী সরকার,যা দেশের অর্থনীতির মূলশক্তি যুব সমাজের আশা আকাঙ্খার ফসল। এই জন্যই কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বৈষম্য দূরীকরণ,সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাস্ট্রগঠনে তাদের প্রত্যাশা ও অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার গুরুত্ব এখন সবচেয়ে বেশি। কারণ দেশের তরুণ প্রজন্মই এখন ইতিবাচক সকল পরিবর্তনের অগ্রদূত,যা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু দেশের যুবসম্পদকে বিগত সময়ে যথাযথভাবে মানবসম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ কম থাকায় তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অথচএকটি দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে মূল্যবান ও সম্ভাবনাময় মানবসম্পদভালো না থাকলে সমাজ বা রাষ্ট্র ভালো থাকতে পারে না। হতাশা দূর করে,তাদের মুখে হাসি ফোটাতে হলে তাদের জন্য শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা ছাড়া বিকল্প নেই পরিসংখ্যান যদি পর্যালোচনা করা যায় তাহলে সহজেই তরুণ সমাজের প্রকৃত চিত্র চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তারা কেমন আছে। বিট্রিশ সাময়িকী ইকোনোমিস্টের ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের’(ইআইইউ) এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের শ্রম বাজারে আসা উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকই চাহিদা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না বা বেকার থেকে যাচ্ছেন। আমাদের স্নাতক ডিগ্রীধারী শতকরা ৪৭ ভাগই বেকার থেকে যাচ্ছে। অথচ এই হার ভারতে ৩৩, পাকিস্তানে ২৮, নেপালে ২০ এবং শ্রীলংকার মতো দেশে ৭ দশমিকি ৮ শতাংশ। আমাদের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ। বিপুল সম্ভাবনাময় এই যুবশক্তির মধ্যে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরেই আছে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ। অর্থনীতির ভাষায় যুবগোষ্ঠীর এই অবস্থাকে এনইইটি (ঘড়ঃ রহ ঊসঢ়ষড়ুসবহঃ, ঘড়ঃ রহ ঊফঁপধঃরড়হ, ঘড়ঃ রহ ঃৎধরহরহম, ঘঊঊঞ) বলা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব মতে তরুণ এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশের মতো। দেশের জন্য এটি অতীব উদ্বেগের বিষয়। অথচ এই যুবশক্তির কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলার ভবিষ্যত নির্ভর করছে। আবার বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই যুব জনগোষ্ঠীই দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে চিত্র এর বিপরীত। জনসংখ্যায় তরুণ জনগোষ্ঠী কমে গিয়ে তাদের অর্থনীতিতে শ্রমশক্তির ঘাটতি নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। উপরের পরিসংখ্যান ও তথ্য থেকে সহজেই দেশের যুব বেকারত্বের ভয়াবহতাও আঁচ করা যায়। অবশ্য এই অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সত্যি বলতে কি বিগত সময়ে যুব বেকারত্ব দূর করতে যথাযথ বিনিয়োগ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো। যুবদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মসংস্থানে সহায়তা তথা জাতীয় যুব নীতিমালায় নানা পদক্ষেপের কথা থাকলেও বাস্তবায়নে গুরুত্ব খুব কমই দেওয়া হয়েছে। ফলে যুব সমাজের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ঘনীভূত হয়ে জন্ম দিয়েছে নানা হতাশা; বিপথগামী হয়েছে অনেকাংশ। যা সমাজের সার্বিক নিরাপত্তা, শান্তি শৃংখলা ও উন্ননের জন্য প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের ৫৪ বছরের বয়সে বেকারত্বের বর্তমান চিত্র থাকার কথা নয়। দেশের সার্বিক যুব উন্নয়ন ইনডেক্স এর অবস্থানও বলে দেয় দেশের যুব সমাজ কেমন আছে। সাধারণত এই সূচকটি দ্বারা বিভিন্ন দেশের যুবদের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।
যুবদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, সুযোগ সুবিধা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করে এই সূচক নির্ধারণ করা হয়। সূচকটি কমনওয়েলথ সচিবালয় দ্বারা প্রকাশ করা হয়। বৈশি^ক যুব উন্নয়ন সূচক ২০২৩ অনুযায়ী, ১৯৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম। সিংগাপুর এই সূচকে বিশ্বের মধ্যে ১ম স্থানে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০২৩ সনের বৈশি^ক যুব উন্নয়ন সূচকে শ্রীলংকা শীর্ষে রয়েছে। এরপর যথাক্রমে ভারত, ভূটান, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অবস্থান। বিশে^ শ্রীলঙ্কার অবস্থান ৭৬তম। বাংলাদেশের অবস্থান থেকেই বুঝা যায় যুবদের উন্নয়নে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১২তম। বেকারের সংখ্যা বিগত সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তজার্তিক শ্রম সংস্থার মতে, (আগষ্ট’২০২২) যুব বেকারত্বের হার বর্তমানে ১০ দশমিক ৬শতাংশ। জাতীয় বেকারত্বের হারের চেয়ে (৪ দশমিক ২ শতাংশ) যা দ্বি-গুণ। সম্মুখের লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ : টেকসই অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সম্মুখের যে পথচলা, তার অগ্রগতি নির্ভর করছে তরুণ প্রজন্মের টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির সাফল্যের উপর। জুলাই’২৪ এর আন্দোলনের মূল চেতনাই ছিল তরুণদের বেকারত্বের অভিশাপ মুক্ত আলোকিত ভবিষ্যৎ নির্মাণ। প্রতিটি যুব-ই তার মেধা যোগ্যতা ও দক্ষতাকে দেশের জন্য কাজে লাগিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন। বর্তমানে আমাদের দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সময়কাল পার করছে। ফলে জনমিতির এই সুফল কাজে লাগানোও আমাদের সামনে এগিয়ে চলার পথে সবচেয়ে বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। যা আমাদের বিনাব্যর্থতায় কাজে লাগানো উচিত। এটা ঠিক প্রতি বছর ২২-২৪ লক্ষের বেশি লোক আমাদের শ্রম শক্তিতে যোগ হয়। প্রকৃত অর্থে এই সংখ্যা নিয়ে দ্বি-মতও আছে।যাই হোক, বিশ^ব্যাংকের তথ্য মতে জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সনের মধ্যে দেশে এক বছরে ২ দশমিক ১ মিলিয়ন কর্মসংস্থান দরকার। ফলে বিপুল যুব জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে আমাদের পরিপূর্ণ নজর দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রেও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে-যেমন যুব বা তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও যোগ্য করে গড়ে তোলা, উদ্যেক্তা ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচি বৃদ্ধি করা। উদ্যেক্তা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি করা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বাজারজাতকরণ সমস্যা দূর করা এবং নিরাপদ-ই কমার্স ও অনলাইন ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা দূর করা। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য সরকারিভাবে দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা। চতুর্থ শিল্প বিল্পব ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সসহ প্রযুক্তিগত জ্ঞান-দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি করা, ফ্রি-ল্যান্সিং পেশার প্রসারে প্রশিক্ষণ সহায়তা আরও বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন নিশ্চিত করাও আবশ্যক। তারুণ্যের শক্তি সকল বাঁধা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগিয়ে চলে, এটাই তারুণ্যের চরিত্র। কিন্তু এই এগিয়ে চলার পথে রাষ্ট্রকেই তরুণদের যোগ্য করে তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে।
পরিশেষেঃ
আমাদের তরুণ সমাজই নতুন বাংলাদেশ গড়ার মূলকারিগর। আগামীর সুখী, ঐক্যবদ্ধও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রায় তাই দেশের মূল্যবান মানব সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে তাদের
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ছাড়া বিকল্প উপায় নাই। কর্মহীনতার অভিশাপ থেকে তরুণ প্রজন্মকে মুক্ত করতে হলে সরকারি-বেসরকারিখাতে যুবদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের বন্ধুপ্রতীম উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সহায়তায় আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তালমিলিয়ে তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে অভিবাসী হিসেবে তরুণ সমাজ সম্ভাবনাময় রেমিটেন্স খাতে আয় বাড়াতে পারে। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তরুণ সামজের আগ্রহও অনেক বেশি। তাদের নানা উদ্ভাবনী চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে উৎসাহিত করা গেলে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। নতুন নতুন খাতে উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আমাদের তরুণরা উদ্যোক্তা হতে চায়। উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের সহায়তা দিলে অর্থনীতি বদলে যাবে। বিশেষ করে কৃষি ও আইটি খাতে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করার অনেক সুযোগ আছে। যুবদের ক্ষমতায়ন করতে হবে। আমরা জানি তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ কর্মসংস্থানের সংকট থেকেই মূলত জুলাই-২৪ এ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। তাই অর্থনীতিতে তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ,
নেতৃত্ব ও অবদান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা সম্ভব। কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ উন্নত দেশগুলোতেও আছে। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমানে জনমিতির যে সুযোগ চলমান আছে, তা পৃথিবীর অনেক দেশেই নাই। তাই আমাদের যুব সম্পদই এখন আমাদের মূল সম্পদ। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় লিড মন্ত্রণালয় হিসেবে গুরুত্বসহকারে দেশের আগামীর সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যুব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে এটাই তরুণ সমাজের প্রত্যাশা। সমৃদ্ধ, সুন্দর ও ঐক্যবদ্ধ নতুন বাংলাদেশ-ই আমাদের আগামীর স্বপ্ন।
লেখক : উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কিশোরগঞ্জ।