সম্মেলনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে চেয়ারম্যান ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে এ অংশের মহাসচিব নির্বাচন করা হয়।
জাতীয় পার্টির জিএম কাদের অংশকে বাদ রেখে রওশন এরশাদপন্থিদের নিয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মো. মুজিবুল হক চুন্নুর আরেক অংশের ঐক্য হয়েছে; সম্মেলনে নতুন কমিটিও গঠন করেছে এক হওয়া এ দুই অংশ।
শনিবার রাজধানীতে এ সম্মেলনে দলের আগের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে এই অংশের চেয়ারম্যান এবং কো-চেয়ারম্যান ও এক সময়ের সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব নির্বাচন করা হয়েছে।
এছাড়া কাজী ফিরোজ রশিদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান এবং মো. মুজিবুল হক চুন্নু নির্বাহী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
রাজধানীর ইমানুয়েল কনভেনশন সেন্টারে জাতীয় পার্টির এই অংশের সম্মেলনে তাদের নির্বাচন করা হয়। জিএম কাদের অংশকে বাদ রেখে রওশন ও আনিসুলদের এই দুই অংশের সম্মেলনকে দলের ‘দশম জাতীয় সম্মেলন’ হিসেবে দাবি করা হয়েছে।
এতে সারাদেশ থেকে আসা প্রায় তিন হাজার কাউন্সিলরদের কণ্ঠভোটে নতুন কমিটির এই চারজন নির্বাচিত হন।
গত ৭ জুলাই জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুসহ দলের ১০ নেতাকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
পরে অব্যাহতি পাওয়া নেতারা আদালতের দ্বারস্থ হলে ৩১ জুলাই জি এম কাদের এবং যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলমের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত।
এরমধ্যে এদিন জি এম কাদেরকে সরিয়ে রেখেই দশম সম্মেলন করে জাতীয় পার্টির আনিসু মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার ও চুন্নু অংশের নেতারা। এতে দলের রওশনপন্থি অংশের নেতা কাজী ফিরোজ রশিদসহ অন্যদের দেখা যায়।
সম্মেলন শেষে দলটির এ অংশের সদ্য নির্বাচিত চেয়ারম্যান আনিসুল মাহমুদ প্রতিশ্রুতি দেন জাতীয় পার্টি থেকে আর কাউকে ‘অন্যায়ভাবে’ বহিষ্কার করা হবে না।
তিনি বলেন, “আমি ওয়াদা করছি, এখন থেকে কাউকেই কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া বা অভিযোগ ছাড়া সভাপতি নিজে বহিষ্কার করতে পারবেন না। আমরা সেই ধারা সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে দিচ্ছি। আমরা পার্টিকে গণতান্ত্রিক করতে চাই। কোনো এক ব্যক্তির বিজনেস হাউজ বানাতে চাই না।”
আনিসুলসহ অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বহিষ্কারের প্রসঙ্গ ধরে আবার জাপাতে একাংশের ভাঙনের নেতৃত্ব দেওয়া আনিসুল অভিযোগ করেন, “২৮ জুন আপনি (জিএম কাদের) বলেছিলেন, আপনি কাউন্সিল করবেন। কাউন্সিল যদি করার ইচ্ছা থাকত, আজকে যেভাবে করা হয়েছে, এভাবেও তো কাউন্সিল করা যেত। কিন্তু তিনি যখন বুঝেছেন আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। তিনি আর কাউন্সিল করেননি।”
গণ অভ্যুত্থানে ৫ অগাস্টের পট পরিবর্তনের পর একটি সুন্দর বাংলাদেশের প্রত্যাশা করলেও সেটি হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কিন্তু আমরা কী দেখেছি, আজকে বুকে হাত দিয়ে বলেন, এক বছর হয়ে গেছে। পরিবর্তন কী ভালোর দিকে না উল্টো দিকে গেছে?
“অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এসে দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশে। আপনারা বলছেন, চুরি বন্ধ করেছেন। আপনারা বলছেন, দেশের টাকা এখন আর বাইরে যায় না। তাহলে এখন কেন আপনাদের প্রবৃদ্ধি কমবে? যে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশ।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান বলেন, “একজন সাংবাদিককে দুই একদিন আগেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দেশের বর্তমান যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, এটা নিয়ে কোনো আশাব্যঞ্জক দিক আমরা দেখতে পাচ্ছি না।”
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে কিনা সেটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আপনারা নির্বাচন করার কথা বলছেন, কিন্তু সেই নির্বাচন করার সেই পরিবেশ বাংলাদেশে বর্তমানে আছে কিনা। আপনারা যেখানে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে পারছেন না, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারছেন না, সেখানে আমরা কিভাবে আশা করব, একটা নির্বাচন হবে যেটা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে৷”
সরকারের উদ্দেশে আনিসুল বলেন, “যে সংস্কারের কথা আপনারা বলছেন, সংস্কার আপনারা করতে পারবেন না। আপনারা দিক নির্দেশনা দিতে পারবেন। আপনারা একটা বোঝাপাড়া করাতে পারবেন, এই সংস্কার কেবল আগামীর সংসদই করতে পারবে।
“সরকারকে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে নিয়ে বসতে হবে, যে কীভাবে আমরা একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারব।”
সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে জাতীয় পার্টির (জেপি) সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদ, মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবু হোসেন বাবলা, জাতীয় মহিলা পার্টির সভাপতি নাজমা আক্তার বক্তব্য রাখেন।
এদিকে মূল স্রোতের বাইরে গিয়ে যারা জাতীয় পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছে, তারাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
এদিন দলের প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদের ভাই জি এম কাদেরকে সরিয়ে রেখে জ্যেষ্ঠ নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে সম্মেলনের পর রাজধানীর কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় মিলনায়তনে জাতীয় তরুণ পার্টির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এমন মন্তব্য করেন শামীম হায়দার।
তিনি বলেন, “জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জিএম কাদেরের অনুসারীরা। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের নেতৃত্বে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছে।
“জিএম কাদেরের নেতৃত্বেই জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। জাতীয় পার্টি হবে এদেশের আপামার জনতার ভরসার ঠিকানা।”