ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন মানেই শিক্ষার্থীদের এক নতুন স্বপ্ন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে ছাত্রদল তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। আবাসন সংকট থেকে শুরু করে শিক্ষার মানোন্নয়ন পর্যন্ত নানা ধরনের প্রতিশ্রুতিতে সাজানো হয়েছে তাদের এই ইশতেহার।
তবে, এই ইশতেহার কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের আশা পূরণ করবে, নাকি নতুন কোনো সংশয় তৈরি করবে? এই প্রশ্নগুলোই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) ছাত্রদলের প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান লিখিত ইশতেহার পাঠ করেন। আবিদ-হামিম-মায়েদ পরিষদ ঘোষিত ইশতেহারে আবাসন সংকট নিরসন, হল ও কো-কারিকুলার কার্যক্রমের উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সেবা ডিজিটালাইজেশন, লাইব্রেরি ও শিক্ষার মানোন্নয়ন, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং পরিবহন সুবিধার উন্নয়নের মতো নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহারে তাদের দৈনন্দিন সমস্যার প্রতিফলন রয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতে জায়গা পেয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এও প্রশ্ন রয়েছে— নির্বাচনে জয়ী হলেও এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা পূরণ করতে পারবে ছাত্রদল সমর্থিত প্রতিনিধিরা? নাকি তারা তাদের মাদার পার্টি অর্থাৎ বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে?
কী বলছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা?
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ডাকসু নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত জানিয়েছেন ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদকের কাছে। ইশতেহারটি তাদের মধ্যে আশার জন্ম দিলেও, প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়ে তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন।

‘দলটির ১৫ বছরের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা নির্বাচিত হলে তাদের ইতিবাচক উপায়ে প্রতিশ্রুতি পালনে অনুপ্রেরণা দেবে। অতীতের বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তাদের বৈষম্য দূর করার পথ দেখাবে। গত ১৫ বছরে শিক্ষার্থীদের রাজনীতিমুখী করে যে নোংরা জালে আবদ্ধ করা হয়েছিল, সেখান থেকে ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার দিকে ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
‘একইভাবে, ভেঙে পড়া রাজনৈতিক কাঠামোকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করাই ছাত্রদলের লক্ষ্য। তারা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ভেঙে একটি শিক্ষামুখী সমাজের স্বপ্ন দেখছে, যেন ভবিষ্যতে শিক্ষিত, দক্ষ ও সৎ ছাত্রসমাজই প্রশাসনের হাল ধরতে পারে।’
ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিহাদ হাসান বলেন, ইশতেহার হলো ভোটার ও প্রার্থীর মধ্যে আস্থার একটি মাধ্যম। ছাত্রদলের ইশতেহারে শিক্ষা, গবেষণা, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসন, চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে অনেক প্রতিশ্রুতিই এমন, যা দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। ডাকসুর সীমিত ক্ষমতায় এগুলো সরাসরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তাদের প্রধান ভূমিকা মূলত আন্দোলন, আলোচনা ও প্রশাসনকে প্রভাবিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

‘বছরের পর বছর ধরে তারা ডাকসুতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেনি। ফলে মাঠপর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক শক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তবে জাতীয়তাবাদী আদর্শের কারণে ছাত্রদলের একটি শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী আছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো— তারা শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়া বুঝে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে কি না। শুধু কাগজে-কলমে ইশতেহার নয়, নির্বাচনের আগেই শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনে তাদের বাস্তব কাজ দেখাতে হবে।’
জিহাদ হাসান আরও বলেন, ছাত্রদলের ইশতেহার শিক্ষার্থীবান্ধব হলেও নির্বাচনের পর আসল চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। আস্থার ধারাবাহিকতা ও বাস্তব কর্মযজ্ঞই তাদের সফলতা নির্ধারণ করবে।

‘আমি আশা করি, ছাত্রদল জয়ী হলে তাদের ইশতেহারকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেবে। তবে একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে তাদের জয় যেন শুধু দলীয় স্বার্থকেন্দ্রিক না হয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, এমন দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রতিফলন থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।’
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিম উদ্দীন বলেন, ছাত্রদলের ১০ দফা ইশতেহারকে শিক্ষার্থীবান্ধব, অগ্রগতিমূলক এবং টেকসই বলা যায়। এই ইশতেহারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের নানা সংকট এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

‘এ ছাড়া, গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য ক্যাম্পাসে পার্ট-টাইম চাকরির সুযোগ, সহজ ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং সবুজ ও প্রাণীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনেরও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।’
নাজিম উদ্দীন আরও বলেন, একটি নিয়মিত ও কার্যকর ডাকসু প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় চাওয়া। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা নিশ্চিত হলে এই ইশতেহার বাস্তবায়নে কোনো বাধা থাকবে না। ছাত্রদলের ১০ দফা ইশতেহারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার প্রায় সব বিষয়ই উঠে এসেছে। তাই আপাতত আর কোনো বিষয় যুক্ত করার প্রয়োজন দেখছি না। তবে ভবিষ্যতে নতুন কোনো দাবি এলে শিক্ষার্থীরা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে তা আদায় করে নিতে পারবে।

‘ছাত্রদল তাদের মূল সংগঠন বিএনপির বাইরে গিয়ে কতটা নিরপেক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে পারবে, সে বিষয়েও আমি সন্দিহান। ছাত্রদলের প্রতি আমার শুভকামনা রইল এবং আমি আশা করব, তারা নির্বাচিত হলে তাদের প্রণীত ইশতেহারগুলো বাস্তবায়ন করবে।’
ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল বাশার বলেন, ডাকসু কোনো দলীয় নির্বাচন নয়, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচনের একটি আয়োজন। যদি কখনো দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মতের ভিন্নতা দেখা দেয়, আমি বিশ্বাস করি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই অগ্রাধিকার দেবেন।
প্রতিশ্রুত ইশতেহার বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব : জিএস প্রার্থী
জানতে চাইলে ছাত্রদল মনোনীত জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের মূল শক্তি হবে শিক্ষার্থীদের ভোট। শিক্ষার্থীরা যদি আমাদের জয়যুক্ত করেন, তবে তাদের ম্যান্ডেট নিয়েই আমরা কাজ করব এবং প্রতিশ্রুত ইশতেহার বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
দলীয় সিদ্ধান্ত ও শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলে কী করবেন— এমন প্রশ্নে হামিম বলেন, আমরা যেহেতু শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হব, তাই অবশ্যই শিক্ষার্থীদের পাশেই থাকব। তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সবসময় সচেষ্ট থাকব।

ইশতেহার বাস্তবায়নে যদি কখনো দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, সেক্ষেত্রে কী করবেন— এ বিষয়ে জানতে ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান এবং এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে, তারা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনী ইশতেহার কেন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় না— এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আসা প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের জন্য কেবল চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। তবে বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব থাকে কর্তৃপক্ষের হাতে।
‘এ কারণেই অনেক সময় ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ পায় না। তবে দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিত হলে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে আরও জোরালো করা সম্ভব হয়।’
কী আছে ইশতেহারে?
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময়টা যেন প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, শিক্ষণীয়, এবং একই সাথে আনন্দময় সময় হিসেবে মনে রাখতে পারে, সেই লক্ষ্যে সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ।
২. নারী শিক্ষার্থীদের পোশাকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, এবং সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।
৩. বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো তথা সার্বক্ষণিক ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স, ফার্মেসি সেবা নিশ্চিত করা এবং জরুরি ওষুধ বিনামূল্যে প্রদানের ব্যবস্থা করা।
৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে পরিবেশবান্ধব ও ব্যাটারিচালিত পর্যাপ্ত পরিমান শাটল সার্ভিস চালু করা।

৬. রেজিস্ট্রার ভবনে ‘লাঞ্চের পরে আসেন’ কালচার দূর করে ভবনের সার্বিক কার্যক্রম হয়রানিমুক্ত, আধুনিক এবং গতিশীল করার লক্ষ্যে সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপট উত্তোলন, নানাবিধ ফি প্রদানসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ধাপে-ধাপে ডিজিটালাইজড করা এবং ডিজিটাল সার্ভিস সমস্যার জন্য ডিজিটাল সাপোর্ট ডেস্ক তৈরি করা।
৭. বৈচিত্র্যময় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাঙ্গন গড়তে নৃগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি চর্চা উৎসাহিত করা।
৮. বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ইমেইল আইডির স্টোরেজ লিমিট বৃদ্ধি, অ্যাকাউন্টের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং তা ব্যবহার করে বিশ্বমানের অনলাইন জার্নাল ও লাইব্রেরি অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা এবং সকল ছাত্র-ছাত্রীকে বিনামূল্যে ক্লাউড স্টোরেজ প্রদান।
৯. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজায়ন ও প্রাণিবান্ধব ক্যাম্পাস তৈরি।
১০. একাডেমিক ক্যালেন্ডারে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন অন্তর্ভুক্ত করা।